Categories
Article

প্রচারমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব হয়েছে বহুবার — ওয়েলেসলি থেকে হাল আমল

আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদককে স্থানীয় থানায় সমন ও তার ঠিক পরেই তাঁর পদত্যাগের নেপথ্যে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে

বাস্তবের আমপান (মতান্তরে আম্পুন বাআমফান) ঝড়ের মধ্যে প্রায় চোখের আড়ালে ঘটে গেল অন্য রকমের এক ঝড়। এই ঝড় সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রশ্ন নিয়ে। ২৮ মে থেকে ৬ জুন বিষয়টির ওপর মোট ১০টি টুইট করেছেন রাজ্যপাল জগদীপ ধনকর। একাধিক টুইট করেছেন সিপিএম-এর রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র। সামাজিক মাধ্যমে নানাভাবে প্রকাশিত হয়েছে প্রায় এক ডজন লেখা। এককথায় ঠিক এ রকম পরিস্থিতি অভূতপূর্ব। ভারতে সংবাদপত্রের ইতিহাসে প্রচারমাধ্যম বহুবার রাজরোষে পড়েছে। কিন্তু সম্প্রতি প্রচারমাধ্যমের ওপর রাজনৈতিক চাপের একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এই পটভূমিতে আসার আগে ফিরে যাই অতীতের পৃষ্ঠায়।

১৭৯৯ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে ওয়েলেসলি সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ করে একটা আইন প্রণয়ন করেন। এই আইন অনুসারে প্রকাশের আগে বিষয়বস্তু সেক্রেটারিকে পাঠিয়ে অনুমোদন নিতে হত। ছাড়পত্র পেলে তবেই তা মুদ্রিত হতে পারত। একবার একটি কৌতুকপ্রদ ঘটনা ঘটে। ১৮১৮ সালের এপ্রিল মাসে সংবাদ-পরীক্ষক বেলী সাহেব মর্ণিং পোস্ট কাগজের একটি সংবাদ প্রকাশ করতে নিষেধ করেন, কিন্তু পরিচালক ও সম্পাদক হিটলী সাহেব তা উপেক্ষা করে খবরটি ছাপিয়ে দেন। হিটলী জানিয়ে দেন যে আইনটি ইউরোপিয়দের ক্ষেত্রে প্রয়োগযোগ্য। কিন্তু তার মা এদেশীয় এবং তার জন্মও এদেশে ; অতএব তার জন্য আইনটি প্রযোজ্য নয়। যুক্তিটির যথেষ্ট সারবত্তা ছিল।

রাজরোশে সংবাদপত্র সম্পর্কে জানাতে গিয়ে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী জানিয়েছেন,

রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তার একটা কারণ তিনি একটি দৈনিক পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। ১৮৭৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ওই পত্রিকার নাম ছিল দ্য বেঙ্গলি। ১৮৮৩ সালে, অর্থাৎ প্রকাশের চার বছর পর সুরেন্দ্রনাথ কারাবন্দি হন পত্রিকায় সম্পাদকীয় লেখার জন্য। অভিযোগ ছিল আদালত অবমাননার। এটাই ছিল রাজনৈতিক কারণে একজন সম্পাদককে কারারুদ্ধ করার প্রথম ঘটনা। এ নিয়ে প্রবল আন্দোলন হয় এবং সুরেন্দ্রনাথ মুক্তি পান।

১৮৮৩ সালে, অর্থাৎ দ্য বেঙ্গলি প্রকাশের চার বছর পর সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় কারাবন্দি হন পত্রিকায় সম্পাদকীয় লেখার জন্য

১৯০৫ সালে স্বদেশি আন্দোলন শুরু হলে দৈনিক বন্দেমাতরম পত্রিকার সম্পাদক অরবিন্দ ঘোষকে বন্দি করা হয়। সেও সম্পাদকীয় লেখার কারণেই। ওই আন্দোলনের কালে মওলানা আকরাম খাঁ দৈনিক সেবক নামে একটি পত্রিকা বের করেন, তিনিও গ্রেফতার হন, ‘আপত্তিকর’ সম্পাদকীয় লেখার দায়ে এবং এক বছর কারাদণ্ড ভোগ করেন। পরে আমরা দেখেছি রাজনীতিতে মওলানা যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পেরেছেন, তার একটি কারণ হচ্ছে পত্রিকা সম্পাদনা।

স্বদেশি আন্দোলনের সময়ে ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায় অত্যন্ত সক্রিয় রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করেন, তিনিও রাজদ্রোহের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছিলেন তার পত্রিকা ‘সন্ধ্যা’র সম্পাদকীয়ের কারণে। আদালত তাকে শাস্তি দিতে পারেনি, কেননা বিচার যখন চলছিল সে সময়ই তিনি প্রাণত্যাগ করেন। কিন্তু কবি কাজী নজরুল ইসলামকে ঠিকই কারাভোগ করতে হয়েছিল, এর কয়েক বছর পরে। দুর্গাপূজা উপলক্ষে নিজের অর্ধ-সাপ্তাহিক পত্রিকা ধূমকেতুতে বিদ্রোহাত্মক যে কবিতাটি লিখেছিলেন, সেটা আসলে পত্রিকার সম্পাদকীয়ই ছিল।

আরেকটু পেছনের দিকে তাকালে দেখব নীলকরদের নির্যাতনের বিরুদ্ধে লেখার জন্য হিন্দু পেট্রিয়ট পত্রিকা রাজরোষে পড়েছে। যুগান্তর পত্রিকা থেকে অনেকটা অনুপ্রেরণা নিয়ে যুগান্তর দল বলে স্বদেশি বিপ্লবীদের একটি সংগঠনই দাঁড়িয়ে যায়। আর ওই পত্রিকায় লেখার জন্য হাস্যকৌতুকের রচয়িতা শিবরাম চক্রবর্তীকে পর্যন্ত একবার জেল খাটতে হয়েছিল।

আমরা যতই প্রচারমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা বলি না কেন, অতীতে নানা সময় গত দুই শতাধিক বছরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নানাভাবে, কমবেশি প্রচারমাধ্যমের কন্ঠরোধের চেষ্টা করেছে। কখনও এর মাধ্যম হয়েছে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বা বিজ্ঞাপন, কখনও থানা-পুলিশ, কখনও অন্য কিছু। বিতর্ক উঠলে হয় সরকারপক্ষ মুখ বন্ধ করে থেকেছে, অথবা নিজের মত ব্যাখ্যা সাজিয়েছে।

গত ২৩ এপ্রিল সাংবাদিক অর্ণব গোস্বামী ও তাঁর স্ত্রী’র উপর হামলার অভিযোগে দু’জনকে গ্রেফতার করে মুম্বই পুলিশ

গত ২৩ এপ্রিল সাংবাদিক অর্ণব গোস্বামী ও তাঁর স্ত্রী’র উপর হামলার অভিযোগে দু’জনকে গ্রেফতার করে মুম্বই পুলিশ। তাদের বিরুদ্ধে একাধিক ধারায় মামলা রুজু করা হয়ে। একটি সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রধান অর্ণবের অভিযোগ, স্টুডিয়ো থেকে বাড়ি ফেরার সময় গভীর রাতে লোয়ার প্যারেল এলাকায় তাঁর গাড়িতে হামলা চালানো হয়। সেই সময় গাড়িতে তাঁর স্ত্রীও ছিলেন। ‘বিজেপিপন্থী’ সম্পাদককে শিক্ষা দিতে নাকি একটি রাজনৈতিক দলের দুই কর্মী ওই আক্রমণ করে। 

এই ঘটনার প্রায় পাঁচ সপ্তাহ বাদে আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদককে স্থানীয় থানায় সমন ও তার ঠিক পরেই তাঁর পদত্যাগের নেপথ্যে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে। বহুচর্চিত বিষয়টি নিয়ে আমি এখানে নতুন করে কিছু লিখলাম না। সংশ্লিষ্ট অভিযোগের প্রমাণ বা অভিযুক্ত পক্ষের কোনও মতামত পাওয়া যায়নি। কিন্তু থেকে গিয়েছে সংশ্লিষ্ট চিঠি, বিভিন্ন লেখা/ মতামত, প্রচারমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে রাজ্যপালে ধনকরের ১০টি ও সূর্যকান্ত মিশ্রর ৪টি টুইট। মূল প্রশ্ন আবর্তিত হয়েছে ওই সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিয়েই। 

দেখা যাচ্ছে যুগান্তরের সাথে সাথে অনেক কিছুই বদলে যায়। কিন্তু সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্কের সেই ট্রাডিশন আজও চলছে। মুক্ত মিডিয়া যেন বরাবরের সোনার পাথরবাটি।


Google translation

Media Freedom Denied Time & Again — From Wellesley To Recent Times

In the real Amphan storm, another kind of storm happened almost blindfolded. This storm raises the question of press freedom. From May 26 to June 6, Governor Jagdeep Dhankar sent a total of 10 tweets on the issue. CPM’s state secretary Suryakanta Mishra has sent multiple tweets. About a dozen articles have been published on social media. In a word, such a situation is unprecedented. In the history of newspapers in India, the media has been angered many times. But recently there have been multiple allegations of political pressure on the media. Let’s go back to the last page before coming to this background.

In May 1899, Wellesley enacted a law depriving the press of its independence. According to this law, before publishing, the content had to be sent to the secretary for approval. It could have been printed only if the clearance was obtained. Once a funny incident happened. In April 1818, Mr Bailey, the news-examiner, forbade the publication of a story in the Morning Post, but Mr Hitley, the director and editor, ignored it and published the news. Hitler said the law applies to Europeans. But his mother is from this country and he was born in this country; therefore, the law does not apply to him. The argument had considerable substance.

Sirajul Islam Chowdhury related the following about state wrath on the newspaper:

As a political figure, Surendranath Bandyopadhyay was a very important and influential figure. One of the reasons was that he used to edit a daily newspaper. Founded in 189, the name of the magazine was ‘The Bengali’. In 183, four years after its publication, Surendranath was imprisoned for writing an editorial in a newspaper. The allegation was contempt of court. This was the first time an editor had been imprisoned for political reasons. There was a strong movement and Surendranath was released. When the Swadeshi movement started in 1905, Arvind Ghosh, the editor of ‘Dainik Bandemataram’ was imprisoned. That is also because of editorial writing. During that movement, Maulana Akram Khan started a newspaper called ‘Dainik Sebak’. He too was arrested for writing ‘offensive’ editorials and was sentenced to one year in prison. Later we saw that one of the reasons why Maulana has been able to play a very important role in politics is the editing of magazines. Brahmabandhab Upadhyay played a very active political role during the Swadeshi movement, he was also accused of treason for being the editor of his magazine ‘Sandhya’. The court could not punish him because he died while the trial was going on. But the poet Kazi Nazrul Islam had to be imprisoned, a few years later. The rebellious poem he wrote in his half-weekly magazine Dhumketu on the occasion of Durga Puja was in fact the editorial of the magazine.

If we look back a little further, we will see that the ‘Hindu Patriot’ magazine is infuriated for writing against the torture of indigo planters. Inspired by Jugantar magazine, Jugantar Dal is an organization of indigenous revolutionaries. And even Shivram Chakraborty, the author of the comedy, had to go to jail once for writing in that newspaper.

No matter how much we talk about media freedom, in the past, over the last two hundred years, various political parties have tried, in many ways, to silence the media. Sometimes it has been mediated by government patronage or advertisement, sometimes by the police, sometimes by something else. When the controversy arises, the government either keeps its mouth shut, or arranges its own interpretation.

Mumbai police arrested two people on April 23 on charges of assaulting journalist Arnab Goswami and his wife. Cases were filed against them under multiple sections. Arnab, head of an all-India media outlet, alleged that his car was attacked in the Lower Parel area late at night while returning home from the studio. His wife was also in the car at the time. The attack was carried out by two activists of a political party to teach the ‘pro-BJP’ editor.

About five weeks after the incident, the editor of Anandabazar was summoned to the local police station and immediately after his resignation, allegations of political interference were made. I have not written anything new here on the much-discussed subject. No evidence of the relevant allegation or any opinion of the accused party was found. But there are 10 related letters, different writings / opinions, 10 tweets from Governor Dhankar and 4 tweets from Suryakanta Mishra regarding freedom of media. The main question revolves around the freedom of the press.

It turns out that a lot has changed with the epoch. But that tradition of debating the freedom of the press continues today. Free media is like a golden stone.

By Ashoke Sengupta

সাড়ে তিন দশকের ওপর সাংবাদিকতায়। ৩২ বছর ছিলেন আনন্দবাজার পত্রিকায়। চার বছরের ওপর (১৯৯২-‘৯৭) ছিলেন জার্মানির কোলোনে আন্তর্জাতিক সম্প্রচার সংস্থা ‘ডয়েচে ভেলে‘-র বাংলা বিভাগের সম্পাদক হিসাবে। উৎকর্ষ সাংবাদিকতার জন্য পেয়েছেন নানা স্বীকৃতি। এখন একটি সর্বভারতীয় সংবাদ সংস্থার কনসাল্টিং এডিটর। ওয়েস্ট বেঙ্গল ইউনিয়ন অফ জার্নালিস্টসের সহ সভাপতি এবং ন্যাশনাল ইউনিয়ন অফ জার্নালিস্টস (ইন্ডিয়া)-এর কেন্দ্রীয় সম্পাদকমন্ডলীর সদস্য।

View Archive